পোস্টগুলি

2024 থেকে পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে

ডিসেম্বরের শীত

সদানন্দ বরাবরই বিশাল বিশাল প্লানিং করে। যার কোনটাই শেষ পর্যন্ত সফল হয় না। গতকাল সারাদিনে সে আমারে তিনবার কল দিসে আড্ডা দিতে যাবার জন্য। প্রতিবারই আমি শুধু হাসছি।

কারন তার প্লানিং এ সে কখনো অন্যদের সমস্যারে গোনায় ধরে না। আমি যখন দুপুরের খাবার রেডি করতেসি, সে তখন গাড়ি নিয়া বের হইসে তেল নিতে।

যার ইকোনমিক কন্ডিশন যত ছড়ানো সে তত বেশি ঝামেলায় থাকে। আমার ঝামেলা খাবার রান্না করা নিয়ে, তার ঝামেলা গাড়ির তেলের লাইন লম্বা হওয়া নিয়ে।

মানুষ বড়ই বিচিত্র। আমাকে কালকের চিন্তা করতে হয়না, আবার কাউকে আজকে বাজার কিভাবে হবে সেই চিন্তা করতে হয়। পৃথিবীটা খুব নিষ্ঠুর একটা জায়গা।

এই দুঃখ ভুলতে সন্ধ্যায় রাসেলের ফোন পেয়ে চলে গেলাম। রাসেল কালেভদ্রে ফোন দেয়। তার নাম শুনলেই আমার ই-ভ্যালির কথা মনে পড়ে। রাসেলের আড্ডায় গিয়ে কিছু মুমিন বান্দা পেয়ে গেলাম। এরা সবাই নামাজ পড়ে ঠিকমত, কিন্তু মদ খাওয়া হারাম এইটা বিশ্বাস করে না।

আসলে জগতের সকল আনন্দ পাপে। পূন্যের ফল চোখে দেখা যায় না। আর আনন্দ বাদে মানুষ বাঁচে না। মইরা গিয়া ধর্ম পালনের কোন মানে দেখি না।

পল্টনের আশেপাশে যে এত এত বিদেশী মদ পাওয়া যায় সেটা আমি জানতাম না। গতকালকের সভায় এই বিশেষ জ্ঞান লাভ করে আমি খুব প্রীত হলাম। দেশ তাইলে পুরা ডুবে যায় নাই। কয়দিন খালি ডুব দিয়া ছিলো। বিপ্লব হোক আর যাই হোক, বাঙ্গালি আসলে একটা ফুর্তিবাজ জাতি।

রাত এগারোটায় জলসা ভেঙে কিছু লালপানি গলায় দিয়ে রাস্তায় নামলাম। রাতের ঢাকা খুব সুন্দর। কিছু শীত ইতিমধ্যে নেমে গেছে। শাহবাগের রাস্তায় এক তরুনী দেখলাম খুব সাজগোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। থাকুক... কিছু মানুষের উষ্ণতা দরকার। টাকার বিনিময়ে সেটা কিনতে পারলে সমস্যা কই? 

রাস্তঘাট ফাঁকা, অঘোষিত ক্যান্টনমেন্ট ঢাবি, দশটার পর তার দরজা খুলে দেয়। টিএসসিতে ধুন্দুমার মানুষের ভীড়।

এই শহরে আসলে আড্ডা দেয়ার জায়গা নেই, মানুষের আনন্দ করার কোন জায়গা নেই। ঢাকা একটা নিরানন্দ শহর। কেউ একজন আনন্দ করতে গেলেই, আরেকজন বলে - চুপ!

মিনা বাজার

আজিমপুর মিনা বাজার আউটলেটে গেলাম সেদিন। উবার আসতে দেরি করতেসে তাই হুদাই এটা ওটা নাড়তেসি। ঢাকা ভার্সিটির দিকে নাকি পোলাপান সব গেইট আটকাইয়া নিজেদের ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ঘোষনা করেছে। তাই এলাকা জুড়ে বিশাল জ্যাম। উবার চালক খালি বলে আসতেসি, কিন্তু আসার নামগন্ধ নাই।

শেলফে দেখলাম মোয়া, নাড়ু এইগুলা রাখা আছে। কিন্তু প্রচুর চাইনিজ তেলাপোকা ঘুরঘুর করতেসে সেগুলার উপর। একটা চিড়ার প্যাকেটের ভিতরেও দেখলাম কয়েকটা আছে।

একজনরে ডাক দিয়ে দেখাইলাম, বেডি কিছু না বলে চিড়ার প্যাকেট নিয়ে চলে গেল। আমি আর মোয়া কিনলাম না। কয়েকটা ড্রিঙ্কস নিয়ে কাউন্টারে চলে গেলাম। টিন ফুটা কইরা অন্তত চাইনিজ তেলাচুরা ঢুকতে পারবে না।

- ভাই আপনাদের খাবারের শেলফে প্রচুর তেলাপোকা। এইগুলা তো ফালাই দেয়া দরকার।

কাউন্টারের ছেলেটা ব্যাপক ব্যস্ত। শুধু বলল- "তেলাপোকার ঔষধ দিতে হবে।"

- তেলাপোকার ঔষধ পাশের শেলফেই আছে। আমি দিয়ে দেই?

পোলায় কোন কথা বলে না। একটা হিমু হিমু ভাব আছে এর মধ্যে। জগতে দুই-চাইরটা তেলাপোকা থাকলেই কি আর না থাকলেই কি?

- তেলাপোকা তো কামড় দেয় না।

এই মহাজ্ঞান লাভ করে আমি মিনা বাজার থেকে বের হয়ে আসলাম। অর্বাচীনের সাথে তর্ক করে কি লাভ? এই দেশের মানুষ যেরকম সুপারশপও সেরকম হবে। এইখানে তেলাপোকা আর ইঁদুর থাকাটা খুব স্বাভাবিক!

একজন ম্যাজিট্রেটকে ফেইসবুকে মাঝেমধ্যেই দেখি ব্যপক ভাবের সহিত সব জায়গায় গিয়ে তদারকি করেন। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে দেশে কোন ট্রেইনিং দেয়া হয় কিনা জানি না। দোকান খোলার আগে সার্টিফিকেশন লাগে কিনা জানি না।

এরা যদি মদ বেচত তাইলে অবশ্য আমি মাইন্ড করতাম না। মদে কোন ভেজাল নাই। পুরান মদ টেস্টি হয়।

মিনা কার্টুন দেখতাম ছোটবেলায়। সে দৈত্যের কাছে স্বপ্নে ল্যাট্রিন চায়, কেন চায় আজও আমি বুঝি নাই। আমরা ল্যাট্রিন বিপ্লবে সফল হয়েছি। ইন্ডিয়ানরা নাকি এখনও খোলা আকাশের নিচে হাগে। প্রাকৃতিক কাজ প্রকৃতির সান্নিধ্যেই উত্তম।

আমরা উত্তম জাতি। আমরা বিপ্লবী।

উবার আসছে। সে খিস্তি করতেসে। রাস্তায় জ্যাম নাকি ইচ্ছা কইরা লাগাইসে। আমি জিগাইলাম- "লাল স্বাধীনতা কেমন লাগছে।"

- ভাই, মজা কইরেন না। পছন্দ না হইলে নামায় দিবো কিন্তু।

- উত্তম...। আমি চুপ করে গেলাম। তার অবশ্যই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আছে আমাকে নামিয়ে দেয়ার। গন্তব্যে গিয়ে তাকে একটা পাঁচ তারা দিয়ে দেবো।

 


 



বাতির নিচে অন্ধকার থাকে, পানির নিচে কুমির

মন মেজাজ অত্যধিক খারাপ থাকায় কয়দিন বাসা থেকে বের হই নাই। ভোমা আর সদানন্দের পারিবারিক ঝামেলাতেও নাক গলাই নাই। মেয়েলোক ঘটিত ঝামেলায় নাক না গলানোর শিক্ষা আমি ইতিহাস থেকে আমি নিয়েছি। এই কারনে ট্রয় নগরী পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যদিও অনেক ইতিহাসবেত্তা বলবেন পুরো ব্যপারটাই পরকীয়ার কারনে ঘটেছে। কিন্তু চিন্তা করে দেখেন, মেয়ে মানুষ না থাকলে পরকীয়া কিভাবে হবে?

যাক সে কথা, সেদিন সন্ধ্যায় সদানন্দ ফোন দিয়া বলে ভোমা আর সে আসতেসে দেখা করতে। বুঝলাম মিটমাট হয়ে গেছে। গেলাম চিল করতে। সদায় মাল খায় না। তাই স্টার কাবাব থেকে একপিস গরুর শিক কিনে দিল। আমি আর ভোমা কিঞ্চিত জলপান করলাম। সেখানেও সদার কাছ থেকে কিছু খসানো গেলো। যদিও বারে আমরা জলপান করার জন্য যাই না। বারের খাবার আর সালাদ খুবই উচ্চমার্গীয় হয়। সেইটার লোভেই বারে যাওয়া।

সদানন্দরে জিজ্ঞেস করলাম, টেকাটুকা কই পাস? বউয়ের কাছ থেকে নিছস?

- বউ দিবো কেন? এইটা ব্যাংক থেকে লোন নিসি। সেইটাই খরচ করতেসি। মাসে মাসে কিস্তি দেই ব্যবসার থেকে। শেষ হইলে আবার লোন নিমু।

- অসাম... আমি মনে মনে বললাম।

ভোমায় বলল, প্যাড়া নাই বন্ধু চিল। টেকা আছেই খরচ করবার জন্য। ব্যাংকের হোক আর নিজের হোক, টেকার ধর্মই খরচ হওয়া।

আমি এই ব্যাপারে আর কথা বাড়াই না। বারে অনেক দাড়িওয়ালা মুরুব্বী দেখা যাচ্ছে। দেশের পরিস্থিতি খুব খারাপ। কে কার থেকে বড় ইতর এইটা প্রমানের আপ্রান চেষ্টা চলছে। আর বাদ বাকি দর্শক যারা আছে, তারা সবাই এখানে সালাদ খাইতে আসে আমাদের মতো।


ঝগড়া

সদানন্দ আর ভোমায় ঝগড়া লাগসে। প্রথমদিন সদানন্দ ফোন দিয়া কি যে কইল সেইটা আমার মাথার উপর দিয়া গেল। তবে এটা শিওর - ভোমায় অরে খান... মাগি কইয়া গাইল দিসে। তার বউরে নিয়াও নাকি মেলা আকাশ-পাতাল বক্তব্য দিয়েছে।

আমি শুধু শুনলাম আর হুঁ হুঁ করলাম। 

কোন মন্তব্য করতে পারি নাই দেইখা সদানন্দ কিছুটা ক্ষেপল আমার উপর। দুইবার ফোন দিয়াও তারে পাই নাই পরেরদিন।

এরপর ভোমায় আবার ফোন দিয়া একইরকম স্ক্রিনশট পাঠায়া কয়, সদানন্দ হালায় একটা মাতাল, উজবুক।

আমি শুধু শুনলাম আর হুঁ হুঁ করলাম। 

অন্যসময় কেউ ঝগড়া লাগলে মনে বেজায় আনন্দ হয়। আজকে কিছুই ফিল হইল না। নিরব থাকলাম। তারমানে আমি কবি হতে পেরেছি।

কারন, "কবি এইখানেই নিরব।"

নিরবতা আবার সম্মতির লক্ষন। সেই হিসেবে সদানন্দ আর ভোমা দুইটাই বলদ কিসিমের। সেইটাতে আমি সম্মতি দিসি। মারামারি লাগসে তাদের বউগো কথাবার্তা নিয়া। মাইয়ালোকের ক্যাচাল বিয়ার পরেও গেলনা। এই জন্যেই কবি বলেছেন পুরুষের সবথেকে বড় শত্রু তার নুনু।

বিয়া জিনিসটার ম্যালা ক্যাচাল আছে। না করলেও সমাজ বলবে তুমি খারাপ পাড়ায় যাও, আর করলে বলবে বউয়ের কথায় চলো।

সমাজের চুষ্টি গুদি তাই।

দুইদিন পরে, ভোমার ম্যারেজ এনেভার্সারিতে সদারে ফোন দিয়া সে সরি বলছে। ডিনারের দাওয়াত দিসে। আমি যামু কিনা চিন্তা করতেসি। দাওয়াতের ছদ্মবেশে এটা একটা ট্র্যাপ হইতে পারে। দেশে এই রকম মেটিকুল্যাস ডিজাইনের অনেক কিছু ঘটে গেছে। "সুই হইয়া ঢুইকা ফাল হইয়া বের হবার" ইতিহাস এই জনপদে অসংখ্য। আগে এদের নাম মিরজাফর আছিল। এখন অর্গানাইজার নাম নিসে।

আমি হালকার উপর চিপায় ঢুকে যেতে চাচ্ছি। দুই পক্ষের মারামারির মধ্যে থাকলে সমস্যা।

 


রাস্তা

পাশের বিল্ডিঙের  গ্যারেজে বাইক রাখি। নিজেরটা ভাড়া দেয়া। এইটারে বলে বিজনেস। গ্যারেজে বাইক রাখতে গিয়া দারোয়ান সাম এর সাথে দেখা। এইটারে দেখলেই আমি দ্রুত এলাকা থেকে ভাগতে চাই। শালা সারাদিন বিড়ি খায় আর আমারে দেখলেই চা-নাস্তার জন্য পঞ্চাশ-একশ টাকা দাবি করে। 

এই বিল্ডিঙে দুইজন দারোয়ান আছে - একজন সাম আরেকজন দিলীপ। দিলীপ কিছুটা ভালো আর ভদ্রলোক। তার কোন দাবি-দাওয়া নাই। সারাদিন টুলে বসে ঝিমানোই তার কাজ।

তবে সাম কিছুটা বদ প্রকৃতির। সে বিড়ি খায় এবং সকাল বেলা ঘুমায়। আমি বাইক ওয়াশ করে আনলেও, সে বলবে, "বস, মুইছা পরিষ্কার করে রাখসি। চা-নাস্তা খাওয়ার টাকা দিবেন।"

ধোয়া শার্ট আবার ধুইয়া, কেউ পয়সা চাইলে কেমন লাগে? এরে মাসুদরে দিয়ে কেলানি দিলে ভালো লাগত!

কাঁটাবনে যাচ্ছিলাম। রিকশয়ায় এক নব্য দম্পতি। অটোরিকশা গাড়ির লেইন দিয়া সুপার স্পিডে যাচ্ছে। তারে বেশ কয়েকবার হর্ন দিলাম সাইড দেয় না। আমি সামনে গিয়ে পাশ থেকে সুপার স্পিডে তারে একটু ভড়কে দিলাম।

পিছন থেকে আমারে "বানচোত... বলে গালি দিলো মনে হল। হেলমেট থাকায় ঠিক শুনতে পেলাম না।" আবার একটু বাইক স্লো করে অপেক্ষা করলাম। এবার সে গাড়ির লেইন ছেড়ে এসেছে। আমারে দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলে আমি মধুর স্বরে জিগ্যেস করলাম, "হুজুর কি গালি দিয়েছেন?"

- তো এমনে বাইক চালায়?

আমি ঠিক নিশ্চিত না গালিটা কে দিয়েছে। অটোর সিটে বসা বেয়াক্কেলটাও দিতে পারে। আপু নিশ্চিত বাইঞ্চোত মার্কা গালি দিবে না। হাজার হোক তার নিজের বোন থাকতে পারে। আমি কোনভাবেই তার দুলাভাইয়ের মত দেখতে না। আপুর পাশে বসা ভাইয়াও দিতে পারে, আবার সফেদ দাড়িওয়ালা অটোচালকও হতে পারে। যারা অটো রিকশায় ওঠে তারা আসলে নিজের জীবনকে ভালোবাসে না। এরা অন্যকে কি ভালোবাসবে? এদের প্রেমে ভেজাল আছে।

তাইতো মহাকবি খাড়াটান বলেছেন, "যে নিজেকে ভালোবাসে না, সে অটো রিকশায় চড়ে।"

কিছু জ্ঞান দেবো ভাবছিলাম। কিন্তু অটো চালক থামতে নারাজ। সে আমাকে নরকের অভিশাপ দিতে দিতে চলে গেলো। এই সপ্তাহে কিছু পূন্য কামাইসিলাম, সেটা কাটাকাটি হয়ে গেলো। যাক... বাংলাদেশ বেশি পুণ্যবান মানুষের থাকার জায়গা না। এইটা ভদ্রলোকদের জন্য জাহান্নাম।

দেশ স্বাধীন হইলে কি হয় আমি জানি না, এখনও কোন পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না। তবে এই অটো-চালকরা স্বাধীনতা উপভোগ করছে। রাস্তায় মানুষের থেকে এদের সংখ্যা বেশি।

রাস্তার পাশে বাইক ধোয়ার জন্য মেলা দোকান আছে কাঁটাবনে। আমার পরিচিত একটা দোকানও আছে। সেখানে বাইক থামিয়ে বললাম, ওয়াশ করো।

- ভাই, বাইক তো পরিষ্কারই আছে।
- তাও করো।
- ওকে বস। সে বেজার মুখে পানির হোস আর সাবান আনতে গেলো। তার মুখ বেজার কারন মোবাইলে পাবজি খেলতেসিল। খেলায় ডিস্টার্ব হইসে।

পোলাপান প্রচন্ড বেয়াদব। এদের উন্নতি হবে না। ঠিক মত কাজ করলে আজকে বাইক ধুচ্ছিস, কালকে এরোপ্লেন ধুবি। ভাগ্যের কথা কে বলতে পারে? অভিজ্ঞতা এখন কোন বিষয় না। ভাগ্যে থাকলে তুই দেশের রাজাও হয়ে যেতে পারিস।

ছেলেটা বদ আছে। যখনই রাস্তার পাশ দিয়ে, মানুষ বা রিকশা যাচ্ছে সে পানি দিয়ে তাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে। আমি তারে মানা করলাম সে শুনলো না। এরপর মোবাইলে তার ভিডিও করে রাখলাম। একে ভাইরাল করে দিতে হবে।

আজকাল যে ভাইরাল হবে সেই মারা খাবে। জাস্টিস বলে কিছুতো থাকতে হবে! দেশে আইন নাই, কিন্তু ফেইসবুক তো আছে!

তবে আমি ঠিক করেছি আজকে থেকে আবার ভদ্রলোক হয়ে যাবো। রাস্তঘাটে রিকশা আর অটোওয়ালাদের খিস্তি দেব না। হাজার হোক এই শহরটা তাদের। আর গরীবের কোন পাপ হয় না।

রুমি বলেছিল, সবার সাথে যুদ্ধ করার থেকে, নিজের ইগোকে মেরে ফেলো। আমি সেই ইগোকে খুঁজছি। পাইলেই খতম!


- - জনৈক বাইকার


গণির পরোটার দোকান

নিচে নেমে দেখি মাসুদ একমনে মোবাইলে কি জানি দেখতেসে। আমি যে পেছনে চলে এসেছি সেটা সে খেয়ালই করে নাই। পেছনে গিয়া বললাম, "হালুম"।

হাতের মোবাইল পড়ে গেল তার ভয় পেয়ে।

- কি করো তুমি? 

সামরিক কায়দায় আমাকে স্যালুট দিয়ে বলল, "কিছুনা, বস...।"
- মোবাইলে কি দেখিস, শালা?
- ৩৬ তারিখে নাকি নতুন স্বাধীনতা দিবস হবে, ফেইসবুকে তাই দেখতেসি। আমি লাইক কমেন্ট শেয়ার দিয়ে পাশে আছি।

আমি আক্ষরিক অর্থেই বোকাচু হয়ে গেলাম।

- তোমার বয়স ৪৬, তুমি গেঞ্জিদের সাথে পাল্লা দিয়া আন্ডারওয়্যার পরলে কি হবে? ইউ হ্যাভ টু বুঝতে হবে। নাদান কোথাকার।

- বস এটা নতুন বাংলাদেশ। আপনাদের দিন শেষ, এখন দেশ চালাবে তরুণরা।
- তুই তো বুইড়া ভাম, তুই কি চাস?

মাসুদ বিড়বিড় করে, "পনের বছর কই ছিলেন, ভাই?"

মাসুদের কান বরাবর একটা বন দিলাম। সে মাটিতে পড়ে উঠে আবার স্যালুট দিলো।

- পনের বছর তোর মত কুলাঙ্গাররে তিনবেলা খাওয়াইসি। 

মেজাজটা অত্যধিক খারাপ হয়ে গেলো। জীবনে কোনদিন রাজনীতি করি নাই বলে আজকে দারোয়ান শালায়ও রাজনীতি শেখায়।

গনির দোকানের দিকে রওনা দিলাম। গিয়া আরো মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। গণি দোকানে নাই। তার ছোটভাইরে বসায় রাখসে। এই ছেলে চরম বেয়াদব, দেখলে সালাম দেয়না। আদাব-কানুন কিছু শেখে নাই। গেঞ্জি জেনারেশন।

- গণি ভাই কই?

- ভাইতো পরোটার দোকান দিসে। ওই যে পাশেই। এখন থেকে আমি এখানে বসি। চা দিমু, নাকি কফি।
- কফি-ই দাও। দেখি এইটা কোন মানের শরবত!

যাক সরকার পরিবর্তনে গণির তাইলে উন্নতি হইসে। ফ্যামিলি বিজনেস বাড়সে। আমি কফি হাতে গনির পরোটার দোকানে গিয়া বসলাম। গণিরে মহা খুশি দেখাচ্ছে।

- আসসালামুয়ালাইকুম, ভাই নাস্তা করসেন?

- নাহ। একটা পরোটা দাও দেখি কেমন হয়।

- সাথে মাংস দেই। লাল মাংস কষা আছে। আপনের লাইগা হাফ দাম।

- দাও। একপ্লেট ভাতও দিতে পারো।

- ভাততো ভাই দুপুরের আগে হবে না। 

গণি বেয়ারা রাখসে, আট-নয় বছরের একটা ছেলে। সে এসে পরোটা আর মাংস দিয়ে গেলো। আমি কফিতে চুবিয়ে তেলতেলে পরোটা খাচ্ছি আর একটা একটা করে মাংসের পিস মুখে দিচ্ছি। আর দুই একজন কাষ্টমার আছে, এরা আমাকে সন্দেহের চোখে দেখছে। একেতো আমার চুল কয়েকদিন কাটা হয় নাই। তারউপর একটা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরা। আর বুকের গেঞ্জিতে লেখা, "No Woman No Cry"। দেখতে মনে হয় ডাকাতের মত লাগতেসে আমারে।

- গণি ভাই ব্যবসা তো মনে হয় ভালোই যাইতেসে?

- নারে ভাই, আগেই মনে হয় ভাল আছিলাম।

আমি মাথা নাড়লাম। গণি তার স্বভাব সুলভ চরিত্রে শুরু করতে যাচ্ছে দেশ বন্দনা।

- এখনতো সব পলাতক, দোষ কারে দিবা?

- কপালের ভাই... কপালের।

- আবার কি হইসে? দেশে তো শান্তি কায়েম হইসে এখন।

- এরকম দেশ কি আমরা চেয়েছিলাম?

- আফসোস করো কেন? নতুন লোক নতুন দেশ, তাগোর টাইম দেও।

"হ, ভাই...।" গণি বিড়বিড় করে কি বলল বোঝা গেলো না। আমি খাওয়া শেষ করে টাকা না দিয়েই বের হয়ে গেলাম। গণির আফসোস কিছুটা বাড়ুক।


যাচ্ছে জীবন

কক্সবাজার গিয়া সদানন্দরে বললাম "মাল খাবো"। সে জিহবায় কামড় দিয়া বললো "হারাম"। কোনভাবেই বারে নেয়া গেলো না তাকে। শেষ পর্যন্ত রুমে অর্ডার দিয়া আমি আর ভোমা ককটেল খাইলাম।

পুরাটা সময় সদানন্দ বইসা বইসা মোবাইল গুতাইলো আর আমাদের দিকে জাহান্নামী লুক দিলো।

সদানন্দরে নিয়া ঘোরার একটা ঝামেলা আছে। সে নিজে যা ভাল মনে করে সেটার উপরে আর কারো কিছু বিশ্বাস করে না। এমন এমন রেষ্টুরেন্টে নিয়া গেল খাইতে সেগুলায় আমি মুতার জন্যও যাইতাম না।

আমার সন্দেহ হইতাসে তারে মনে হয় রেষ্টুরেন্ট এর মালিক কমিশন দেয়।

দুইদিনের বেশিরভাগ সময়ই সে রুমে ঘুমাইয়া কাটাইসে, আর অল্প কিছুক্ষন তার জলহস্তীর মতন দেহ নিয়া সুইমিংপুলে ভাইসা ছিলো।

সুইমিং পুলে আবার মেলা নিয়ম কানুন, সেইখানে সুতি জামাকাপড় পইরা নামা যাবে না। শাড়ি আর বোরখা পইরা নামা যাবে না। এক ভাইজান ফুল ফ্যামিলি বোরখা নিয়া নাইমা পড়ল। ব্যাপক একটা ঝগড়া কইরাও পুলের এটেন্ডেন্ট তাদের তুলতে পারল না। ইসলামিক ড্রেস বাদে তারা পুলে নামবে না।

আমি মনে মনে কইলাম "খাইসে"। সদানন্দ একটা টি-শার্ট পরা ছিল।

- স্যার এটা পরে নামা যাবে না।
- এটা পলিস্টারের ব্রো। রঙ উঠবে না। সদানন্দ ঢাহা মিথ্যা কথা বলল।

এটেন্ডেন্ট মন খারাপ করে চলে গেল। মনে মনে গালি দিলেও মুখে কিছু বলা যাবে না।

- তুই জাহান্নামী।
- ক্যান? এইটাতো পলিস্টারই।
- তুই হাফপ্যান্ট পইরা নামসস। তোর হাঁটু দেখা যায়।

পুলের টাওয়েল নিয়া আবার রুমে যাওয়া যাবে না।

- ক্যান, আমি কি ন্যাংটা যামু, নাকি এই ভিজা কাপড়েই যামু?
- না স্যার, এখানে শাওয়ার আছে। শাওয়ার নিয়ে ড্রেস চেইঞ্জ করে যাবেন।
- বালের নিয়ম বানাইসো? দেশের এই দূর্দিনে আমরা পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে টাকা খরচ করতেসি এইগুলা দেখার জন্য?

- স্যার, আমাদের এইখানে এরকমই নিয়ম। এটেন্ডেন্ট আমারে বলল।
- এক কাম করেন হোটেলে ঢুকলে একটা ইউনিফর্ম দিয়া দেন। আমরা লেফট-রাইট করতে করতে ক্লাস করি।

এটেন্ডেন্ট তার মেকি হাসি দিয়ে চলে গেলো।

আসার সময় সদানন্দ বস্তা ভইরা শুটকি কিনসে। তারে একবার বলসিলাম, শুটকি খাইস না এগুলায় ক্যামিক্যাল আছে। তোর লিভার, কিডনি দুচে দেবে। সদানন্দ জানাইসে, এইগুলা গিফট করে দেবো। মরলে আরেকজন মরুক। সে ভেজিটেরিয়ান।

এইরকম ইউনিক ক্যারেকটার হইলেও একটা দিক দিয়া সে ভালো, সে কখনো বন্ধুবান্ধবের খারাপ চায় না। আজ পর্যন্ত যতবার তারে বিপদে আপদে ডাক দিসি বুক পাইতা আইসা খাড়াইয়া গেসে। নিজের থেকে বুদ্ধি দেয়ার চেষ্টা করসে।

তার খারাপ দিক হইল, সে নিজেরে সবার মত বড়লোক মনে করে, আমি দিন আনি দিন খাই টাইপের মানুষ। কিন্তু তার ধারনা আমি ম্যাল্যা টাকাটুকা কামাই।

চিন্তা করসি আগামী তিন মাস তার সাথে যোগাযোগ করব না। দেখা হইলেই পয়সা লস।

শামীম ভাই সমাচার

শামীম ভাইরে দেখলেই আমি টুপ করে কোন একটা গলিতে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করি। বয়সে আমি তার হাঁটুর সমান। তার বয়স ৬০ এর উপরে। কিন্তু প্রতিদিন সকালে তিনি জগিং করতে বের হন। সাদা একটা ট্রাউজার আর ঘিয়া কালারের টি-শার্ট পরে।

এই বয়েসের লোকজনরে সাধারণত আমার চাচা বলে ডাকার কথা। কিন্তু আমি যেহেতু ঘাউরা কিসিমের, আমি কাউরে স্যার বা আংকেল বইলা ডাকি না। আমার কাছে সবাই ভাই। যত মুরুব্বিই হোক আমি ভাই ডাকি। অতীতে দেখেছি, কাউরে চাচা ডাকা মাত্র সে আমারে দেখা হইলে এমনভাবে ভাইস্তা বলে ডাক দেয় যেন আমি মাত্র দুধ খাইয়া উঠছি।

আর সবচেয়ে বড় কথা, মুসলিম-মুসলিম ভাই ভাই। আমি এই নীতি মাইনা চলি।

শামীম ভাইয়ের কথা বলতেসিলাম। একদিন গনির দোকানে দাঁড়ায়া চা-ব্রি সেবন করতেসিলাম। শামিম ভাই আইসা বললেন- "তোমারে চেনা চেনা লাগে।" এইটা হইল কথা জমানোর ধান্দা। বিড়ি খাবার সময় আমি সাধারণত কাউরে চিনি না। অতীতে চিনতে দিয়া পস্তাইসি। এক মালব্রোর দাম ১৮ টাকা এখন আর চা ১০ টাকা। কাউরে চিনা ফেললেই ২৮ টাকা লস।

- হইতে পারে, এলাকায় জন্মের পর থেকে আছি।

শামীম ভাই আমার কথায় মাইন্ড করলেন না। তিনি আইছেন গল্প জমাইতে।

- বাচ্চারে স্কুলে দিয়া আসলা?
- আসলাম, আপনেও কি বাচ্চারে স্কুলে দিসেন? আপনার বাচ্চা কোন স্কুলে পড়ে?
- বাচ্চা না, আমার নাতনীরে দিয়া আসি মাঝে মধ্যে।
- ও... আমি কিছুটা বুকাচু হইয়া গেলাম। কি বলব খুঁজে পাই না।

এরপর ম্যালাদিন তার সাথে চা-ব্রি সেবন কালে দেখা হইসে। তিনি আমারে একদিন জোর কইরা তার বাসায় নিয়া গেলেন। চা কম খাই বলার পরেও, তার বাসায় বইসা চা আর ব্রি খাওয়াইলেন। নিজের বাড়িঘর দেখাইলেন। এই পর্যন্ত সমস্যা ছিলো না। 

কিন্তু তিনি আমারে বিকালে বা সন্ধ্যায় দেখা করতে বলেন। আড্ডা দেয়ার জন্য। বয়স চল্লিশ হবার পরে আমি সাধারণত আড্ডা কম দেই। আমার চেহারায় বালকসুলভ একটা বিষয় আছে। দেখতে ইনসেন্ট লাগে। এই রকম একটা বুইড়ার সাথে আড্ডা দিলে আমার চলে?

তারওপর তিনি সর্বদা আমার পরিবারের কথা জিগ্যেস করেন, কে কোথায় আছেন, কেমনে আছেন, আমি কি করি ইত্যাদি। আমি কত ইনকাম করি - তার এই প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে আমি ক্লান্ত।

তিনি দেশ স্বাধীন হবার আগে, মোবাইলে এলাকার কোন এম্পির লগে তার ছবি আছে, কোন কমিশনারের লগে তার অবৈধ রিলেশন সেগুলা আমারে দেখাইসিলেন। দেশ স্বাধীনের পরে আর দেখান নাই। এই বিষয়ে আমি মাইন্ড খাইসি।

মেলা দিন পর তার সাথে আবার দেখা হইসিলো সেদিন। ফার্মেসির সামনে টুলে বইসা আছেন। জগিং ড্রেস, সেই গোল্ড ফ্রেমের চশমা।

জিগাইলাম "কেমন আছেন?"

- তুমার তো মিয়া কোন খবর নাই।

- আছিলাম একটু দৌড়ের উপর। আমি বিস্তারিত বলতে চাই না। এমন রিমঝিম বৃষ্টির সকালে তার সাথে দেখা হওয়া মানেই এক ঘন্টা নষ্ট।

- বইসা আছেন কেন? আজকে জগিং করবেন না?
- নাহ পায়ে ব্যাথা পাইসি। অটো রিকশা থেকে পইড়া গেসিলাম।
- হ... শালারা মা..দা.। আমি পুরা বাক্য শেষ করলাম না। তিনি জান্নাত হোটেলে আমারে চা খাওয়াইতে নিয়া গেলেন। আমি চায়ের বিল দিয়া দিলাম। মাগনা খাইতে ভালো লাগে না।

আমি আসলে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি দেইখা আসছিলাম চিকেন খিচুড়ি কিনতে। আড্ডা আরোও জমতে পারত কিন্তু আমার খিচুড়ি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ক্লায়েন্টের সাথে জরুরী মিটিং আছে বইলাল আমি পার হয়া গেলাম।

যাবার সময় তিনি তার সেই সদা হাসসোজ্জ্যল ভঙ্গিতে জিগ্যেস করলেন, আমারে ইয়াং লাগতেসে না?

কি আর কমু! কইলাম, আপনে এমনেই দেখতে সুন্দর। একটা রিচার্ড গিয়ার টাইপ লুক আছে। ইয়াং হইয়া কি করবেন?

মানুষ নিয়ে গবেষণা করা এই আমি এখনো তারে ঠিক ধইরা উঠতে পারি নাই। তিনি মানসিক ভাবে সুস্থ, কিন্তু নিঃসঙ্গ একজন মানুষ এইটা বুঝতে পেরে আমার মাঝে মাঝে মায়া হয়। তার থেকে আমি পালিয়ে বেড়াই কারন তিনি বেশি কথা বলেন আর নিজের সম্পর্কে আমি বেশি কথা বলা পছন্দ করি না। আমার কোন এক গল্পে তারে টুক কইরা ঢুকাইয়া দিব।


মাসুদ বিরিয়ানি হাউস

মাসুদের দেখা নাই তিনদিন। সেই যে দেশ স্বাধীনের আন্দোলন হইল, তখন তারে একটু কানমলা দিসিলাম। সেই দুঃখে সে আমার সামনে কয়েকদিন আসে নাই। তবে সিসি ক্যামেরাতে আমি ঠিকই দেখতাম সে পাশের বাড়ির দারোয়ান আর সামনের দোকানের কর্মচারীর সাথে রাস্তায় দাঁড়ায়া সিগারেট খাইতেসে। 

আমারে দেখলেই টুস কইরা লুকাইয়া যায়। যাক, গেইট পাহারায় থাকলেই হলো। যদি চোর আসার পর লুকাইয়া যায় তাইলেই সমস্যা।

কয়দিন সে ডাকাত ডাকাত খেলসে। রাতে সে এমনিতেই ঘুমায় কিন্তু কয়দিন ডাকাত ধরার নাম করে ফুর্তি করসে এলাকায় ঘুরে ঘুরে। পরে শুনেছি সে নাকি রাজনৈতিক দল খোলার চেষ্টা করছে। তাই তারে একটা কানমলা দিসিলাম। সে তখন থেকেই আমারে দেখলেই পালিয়ে যায়।

এরপর একদিন সে আমার কাছে অগ্রিম একমাসের বেতন দাবি করল। দাবি আদায় না হলে নাকি সে বাসার সামনে আমরন অনশন করবে।

আমি তারে বললাম, তোমার দাবি মেনে নেয়া হল। তবে অনশন জারি রাখো। তোমাকে খাবার দেয়া আর কুত্তাকে খাবার দেয়া একই কথা।

মাসুদ অবশ্য রাগ করে নাই। তার সাথে কুত্তার কিছুটা মিল আছে। একমাসের বেতন হাতে পাইয়া সে লাপাত্তা। এবার ফিরুক তারে  কুত্তা দিয়া ডলা দিতে হবে।

এদিকে হাতিরপুলে গিয়ে একদিন দেখি বিরিয়ানির দোকানের নাম "মাসুদ বিরিয়ানী হাউজ।" আমার খুব কষ্ট লাগল। মাসুদ বিরিয়ানির দোকান দিসে অথচ আমারে জানায় নাই। 

এই দোকানে ঢুকে আমি ফ্রিতে বিরিয়ানি চাইলাম, কাউণ্টারের বসা ক্যাশিয়ার আমাকে বিরিয়ানি দিতে চাইলো না। 

- আমি মাসুদের বস। এটা মাসুদের বিরিয়ানির দোকান না?
- আমিই মাসুদ। আপনে আমার বস হইলেন ক্যামনে?
- ওহ... তুমি ভুয়া মাসুদ। আমি আসল মাসুদের বস।
- যেই মাসুদেরই বস হন, বিরিয়ানি ফ্রিতে দেই না। শুধু মাত্র গরীবদের জন্য ফ্রি।
- তুই আমাকে গরীব বলিস? জানিস ঢাকা শহরে আমার তিনটা বাড়ি আছে? চিনস আমারে?

- আমি কখন আপনেরে গরীব বললাম। আপনে মানুষটা ম্যালা ক্যাচাইল্লা। ব্যবসার সময় ঝামেলা করেন না। চাঁদা নিতে আসছেন?
- না, তুই ফ্রি বিরিয়ানি খাওয়াবি। আমি কি গরীব যে তোর কাছ থেকে চাঁদা নিবো?
- তুই তোকারি করেন ক্যান। আপনে বিম্পির লোক?
- কি বললি?

- আচ্ছা ক্যঁচাল কইরেন না। ওই টেবিলে গিয়া বসেন আমি বিরিয়ানি পাঠাইতেসি। বুঝছি।

আমি ফ্রিতে তিন প্লেট বিরিয়ানি খেলাম। আসার সময় ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে ঝাড়ি দিয়ে ১০০ টাকা রিকশা ভাড়া নিলাম। বেচারা সরু চোখে আমারে দেখতেসে। 

- চিন্তা করিসনা, সামনের ইলেকশনে তোকে একটা কমিশনার পদ দিব।

ক্যাশিয়ার বিড়বিড় করে কিছু বলল মনে হয়, আমি শুনতে পেলাম না।

দেশের অবস্থা ভালো না। কে যে কি উদ্দেশ্যে আসে বোঝা যায় না।

মাসুদরে একদিন এখানে নিয়া আসতে হবে। বিরিয়ানি রান্নাটা বেশি ভালো হয়নি। বাবুর্চির পাছা বরবর একটা লাথি দিতে হবে। মাসুদকে দেখাতে হবে রাজনীতি না করে ব্যবসা করাটা ভালো। হালাল পথে উপার্জন।

রিসোর্ট

সদানন্দের উপর মেজাজ মহা খাপ্পা হইসে। শালায় রিসোর্টে যাবে ঠিক করসে। তিনজন মিলা গেলে ঠিক ছিল সাথে বউ বাচ্চারেও যুক্ত করসে। এই কারনে ভোমার কাছে তার নামে নালিশ দিলাম। ভোমা নিজেও দেখি কিছু বলে না। সদার লগে তালে তাল মিলাইতেসে। সাথে আমার বউরেও ভাও করসে। বউ দুইবার আইসা বললে গেসে কেমনে যাবে।

মনডা চায় হালার বিচি বরবর একটা উড়ন্ত চুম্বন দিতে।

আমি বুঝাইতে চাইলাম, দেশের এই অবস্থায় ফূর্তি করতে যাওয়া ঠিক না। আর বউ বাচ্চা নিয়া গেলে সেটারে আনন্দ বলে না। সেটা পিকনিক। তারচেয়ে এই টাকাটা বন্যার্তদের দিয়ে দেয়া উচিত।

আমি জিগাইলাম, কি রিসোর্ট?
সদায় কয়, ফাইভ স্টার।
- সুইমিংপুল আছে?
- আছে।
- বার আছে?
- না নাই।

আমি ঘোষনা দিলাম, এইডা আমার বালের ফাইভ স্টার। একটা গর্ত খুইড়া পানি দিলেই যেমন সুইমিংপুল হয় না। ওইটারে পুকুর বলে। তেমনি যেই রিসোর্টে লালপানির ব্যবস্থা নাই, ঐটা একটা পিকনিক স্পট।

- তুই একটা বালেশ্বর।
- যেই বালই হই, আমার কাছে টাকা নাই।
- টাকা নিয়া কি কবরে যাবি? ভোমায় এতক্ষনে মুখ খুলসে।
- কবরে যামু না, তবে টাকা থাকলে চল্লিশায় ভালো খানাদানা পাকানো যাবে।
- তুই একটা ঘাউরা।
- ঘাউরামির কি দেখসস...। সুইমিং পুলে নাইমা ইয়ে করে দিব যখন তখন সেখানে গোসল করিস। 

- নাটক বাদ দিয়া চান্দা দে।
- টাকা নাই, কিস্তিতে দিতে হবে। পারলে আমারে একটা ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্তা করে দে। দেশ ও দশের উপকারের জন্য রিসোর্টে গিয়া ইবাদত করব।

- যাবি তাইলে?
- যামু, এক শর্তে। আমি ৫০১ নাম্বার রুমের বুকিং চাই।

ধুর বাল। ভাল্লাগে না। সদানন্দ বিরক্ত হয় আর ভোমায় মুচকি হাসে।



পথের মানুষ

বিকেলে গুলশান গিয়েছিলাম দেশের অবস্থা দেখতে। সব জায়গায় গর্ত থেকে পিলপিল করে মানুষ বের হয়ে আসছে। এতদিন কেউ কিছু বলতে পারে নাই, কারন স্বৈরাচার ছিল। এখন দেশ আবার স্বাধীন হয়েছে। সবার মনে প্রচুর আনন্দ।

স্বাধীন মানে পুরাই স্বাধীন, কেউ বাধা দেয়ার নাই। যার যেখানে খুশি যাচ্ছে, যেভাবে খুশি চিল্লাচ্ছে। গতকালই মাত্র প্রধানমন্ত্রী দেশ ত্যাগ করেছেন ছাত্রদের তোপের মুখে পড়ে। জনতা বঙ্গভবনে গিয়ে যে যা পেরেছে তুলে নিয়ে এসেছে। হাজার হোক দেশটা কারো বাপের না, এগুলো তাদেরই সম্পত্তি। আর যুদ্ধ বিজয়ের পর গনিমতের মালের সদ্ব্যবহার করাটা খুব জরুরী।

আমি অবশ্য আজকে গিয়ে ঢুকতে পারি নাই। আর্মির পোষাক পরা লোকজন কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। আমি বলে এসেছি, তুমি ভুয়া আর্মি। আমার মালামাল ভিতরে আছে, আমি পাই নাই। পরকালে তোমাকে এর জন্য জবাব দিতে হবে। 

সে কঠিনভাবে আমার দিকে তাঁকাল। আমি তাতে না দমে তাকে জীব দিয়ে ভেঙ্গচি কাটলাম। নতুন সরকার আসলে নিশ্চই আমাকে আমার ভাগ বুঝিয়ে দেবে।

হেঁটে হেঁটে বিজয় স্মরণী আসলাম। আসার পথে দেখলাম একটা দোকানে ভাঙচুর চলতেসে। একেক জন যা পারতেসে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সাহস করে কাছে যেতেই একজন একটা রাইস কুকার ধরিয়ে দিলো হাতে, বলল এইখানে দাড়াঁন আমি আরেকটা নিয়া আসি। 

আমি বিজয়ীর ভঙ্গীতে রাইস কুকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। এরমধ্যে একজন এসে ফট করে একটা ছবি তুলে ফেলেছে।

- ভাই কি করেন আপনি?
- ভাত রান্ধি...।
- মানে... আপনার হাতে রাইস কুকার কেন?
- দোকানদার নাই, তাই সেলসম্যান আমার কাছে দিয়ে গেছে। বিক্রি করব, একদাম ২৪০০ টাকা।
- দোকানদার কই গেছে, আমরা দেখতে পারছি সবাই ভাঙচুর চালাচ্ছে। এটাই কি ছাত্র আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিলো?

এতক্ষনে দেখলাম তার পিছনে একজন ক্যামেরা হাতে দাঁড়ায়া আছে। আমি পোজ দিয়ে দাঁড়ালাম।

- আন্দোলন আন্দোলনের জায়গায়, গণিমতের মাল, গণিমতের জায়গায়। এইগুলা আমার ট্যাক্সের টাকায় কেনা না?

- কিন্তু এভাবে জিনিসপত্র ভাঙচুর করাটা অনৈতিক মনে হচ্ছে না?

- আপনার কাছে বেচবো না। আপ্নে কালা দল।

আমি রাইস কুকার নিয়ে হাঁটা দিলাম। ক্যামেরা ম্যান আরেকজনরে ধরতে ছুটছেন। যার যার কাজ, তার তার ধর্ম।

গনির দোকানে গিয়া এইটা গণিরে গছায়া দিতে হবে। বসায় রাইস কুকার নিয়ে গেলে আব্বার হাতে প্যাদানি খাইতে পারি।

গণি অবশ্য মহাসুখে থাকার কথা, আম্লিগের পতন হইসে। সে অবশ্য সবসময়ই সরকার বিরোধী। যে সরকারই আসুক তার পুটু মেরে যায়। 

গণি দোকান খুলে বেজার ভাবে বসে আছে। কাস্টমার কম।

- কি খবর গনি ভাই। মন উদাস কেন?

- দেশের কি হইব চিন্তা করি বড় ভাই।
- চিন্তা ভাবনা ছাড়ো আর শরবত বানাও।
- শরবত?
- মানে চা দ্যাও।

গণি চা বানাতে গিয়ে আবার উদাস হয়ে গেলো।

- এই যে প্রাইমিনিষ্টার পলায়া গেলো, এখন ইন্ডিয়ান আর্মি নাকি আমাগো দেশ দখল করব? "র" নাকি চইলা আসছে?
- বাল গেছে, এখন কাকু আসবে। তুমি গণি গণিই থাকবা। টেনশন নিয়ো না। 

- না টেনশন কিসের? দোকান খুলতে পারিনা ঠিকমত, ব্যবসাপাতি ভাল না।
- তোমাকে একটা ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করে দিবো। নতুন সরকার মেলা বড়লোক্স।

- আমি ঋণ দিয়া কি করুম?
- কি আর করবা, চায়ের সাথে ভাতও বেচবা। আর এই যে নাও তোমার জন্য রাইস কুকার আনসি। একদম আমেরিকান মাল ইনটেক। আর, আমার আগের বাকির হিসাব ক্লোজ, রাইস কুকারের দাম ২৪০০ টাকা। তোমারে ডিসকাউন্টে দিলাম।

গণি খুশি হইল নাকি বেজার বুঝলাম না। আসলে গরিবের উপকার করতে নাই। এরা সারাজীবন গরীবই থাকে।

মাসুদরে কাল থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। সে নাকি যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে গেছে। দেখা হইলে কিছু উপদেশ খয়রাত দিতে হবে। নিজের কেল্লা অরক্ষিত রাইখা সে কি করতে গেছে জানতে হবে।


সদানন্দ সমাচার

আমাদের একজন খুব কাছের বন্ধু আছে -"সদানন্দ" (ছদ্মনাম)। তারে এই নাম দেয়ার কারন ও মনে করে সে বাদে সারা দুনিয়ার সবাই খুব আনন্দে আছে।

যখনই দেখা হয় বলে, আছস ত সুখে, তাই বুঝস না।

- কি বুঝব?
- এই যে আমি কত কষ্টে আছি।
- মানুষ মাত্রই কষ্টে থাকে, এতে অবাক হবার কিছু নেই।

- আমার মত ঝামেলায় থাকলে বুঝতি!
- কি বুঝতাম?

সদানন্দ বেশি কথা বাড়ায় না। তার ফোন এসেছে। যেখানেই যায় সারাদিন ফোন আসে। ফোনটা কোনভাবে যদি তার কানে আইকা দিয়ে লাগানো যেতো তবে সে তাই করত। কোথাও আড্ডা দিতে গেলে মনে হয় সে প্রাইমিনিষ্টারের পিএস, এত ফোন আসে যে আড্ডা দেবার সময় পায় না।

সে এতই বিজি থাকে যে, কোথাও যাবার প্লান করলে, ফিরে আসার টিকিট আগে কনফার্ম করে। তারে নিয়ে কোথাও ঘুরতে বের হইলে সে নিজের চার-পাঁচটা কাজ শেষ করে তারপর বলবে, চল কই যাবি? তখন বলতে ইচ্ছা করে তোর হাউয়ায় যাবো... শালা।

তো সদানন্দ আমি আর ভোমা গেসি মাল খাইতে। উত্তরার বার, বেশ পশ ভাব আছে একটা। সদানন্দ উপরে যাবে না। কারন বউ জিগ্যেস করলে সে সব বলে দেয়। তাই সে এই সব হারাম জিনিসের সাথে নাই।

তারে নিচে রাইখাই আমরা উপরে গেলাম। সবাই টাল থাকলে গাড়ি কে চালাবে? 

ককটেলের অর্ডার দিয়া বসছি মাত্র পাঁচ মিনিট হয় নাই, শালায় ফোন দেয়া শুরু করসে।

- কি হইসে?
- তোদের খাওয়া শেষ?
- মাত্রতো আসলাম, অর্ডার দিসি।
- জলদি আয়?
- কেন, বউ ডাকে?
- না... আমার গার্লফ্রেন্ড ফোন দিতেসে। সে নাকি আমারে এই এলাকায় আসতে দেখসে।
- ধুর বাল...। আমি ফোন লাউড স্পিকারে দিলাম।
- এইখানে বেশিক্ষন থাকা যাবে না।

ভোমা একটা কুৎসিত গালি দিলো। ভোমার চাপ দাড়ি দেখে যে কেউ ভাবতে পারে সে খুব পরহেজগার, কিন্তু সে আসলে পুরাই একটা পিস।

- তুই ফোন রাখ শালা, নাইলে তোর বউরে গিয়া কইয়া দিমু তুই আমাগো লগে মাল খাইতে আইসস। ভোমা চিল্লায়।
- মানে কি?
- মানে চানকির নাতি, শান্তিতে মাল খাইতে দে। নিচে বইসা থাক। নাইলে তোর সুগ্যার বেবির সাথে ইটিস পিটিস কর ফোনে।

প্রায় ঘন্টা খানেক পরে আমরা নিচে নাইমা দেখি সদানন্দ গাড়িতে মুখ ভার করে বসে আছে। এমনিতেই মালের ডোজ, তারপর এই নাটক। ভোমা ক্ষেপে যায়।

- তোর সমস্যা কি?
- থাকস তো সুখে, তুই বুঝবি কি?
- তোরে বিয়া কি আমি দিসিলাম?
- বিয়া কই থেকে আসল। মিম রাগ করসে।

- মিমটা কে?
- আমার গার্লফ্রেন্ড।
- ও... তাই ক। এক মাল না খাইলেও তুই অন্য মাল খাস।
- ও খুব ভালো মেয়ে।
- ভালো দিতে জানে... আমি টিপ্পনি করলাম।

- এখন ক মিম রাগ করসে কেন?
- কেউ একজন এইখানে আমারে দেখে ফেলসে। তারে বাদে আমি একা মাল খাইতে আসছি সে এইটা মনে করসে।
- তোর মিম তো মাশাল্লা মেলা চালু মাল। বারে বারে তার পরিচিত লোক আছে দেখা যায়।

সদানন্দ হাসে। নির্মল হাসি। কেউ দেখলেও বুঝবে না এই শালা হারাম বলে মাল খায় না, কিন্তু লদকা লদকি করে।

আমি সিটে হেলান দিতে দিতে বললাম, এক কাজ কর তুই মিমরেও বিয়া করে ফেল। একলগে থ্রি-সাম করবি। এখন একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত ছাড় আর লং ড্রাইভে মাওয়া চল। ইলিশ খামু।

সদানন্দ মুখ ভার করে গাড়ি চালু দেয়। বিড় বিড় করে বলে, আছিসতো সুখে...।

জীবন আনন্দময়! আমি সর্বদাই আনন্দে থাকি।


গণি সমাচার

ণির পুরো নাম আব্দুল মজিদ গণি। তারে মজিদ বইলাই বেশী ডাকি। কিন্তু মজিদ নামটাতে তার আপত্তি আছে। খালি এনআইডি কার্ডে মজিদ আছে বইলাই সে নাকি এইটারে বাদ দিতে পারতেসে না। নাইলে কবেই সে খালি আব্দুল গনি হয়ে যাইত।


একবার ভাবিসিলাম তারে বলি, চাইলেই এনআইডি কার্ড কারেকশন করে নেয়া যায়। পরে আর বলি নাই। মূর্খ লোকজন না থাকলে আমার মত জ্ঞানীর নিজেরে নিজে জ্ঞানী মনে হবে না।

গণিরে জিজ্ঞেস করেছিলাম 'মজিদ নামে তোমার সমস্যা কি?'
সে বলে, মজিদ নামে ডাকলে নাকি নিজেরে বাটপার মনে হয়।
- কেন বাটপার মনে হয়? 
- আর বইলেন না ওই বিদ্যানন্দ নামে নাকি এক বাটপারের সাথে সে শেয়ারের বিজনেস করছিল। পরে ধরা খাইসে।
- ওরে মূর্খ মজিদ.....। তুই মজিদই থাকবি। মনে মনে বললাম।
- ধরা খাইয়া বিদ্যানন্দ দেশের বাইরে চলে গেছে আর পুলিশের কাছে মজিদ ধরা খাইছে। এখন জেলে। দেশের সবাই জানে।
- হোলি ফাক আমিতো জানিনা...।
- কি পাক হইছে ভাই?
- কিছু না। 
- এই কারণে কেউ মজিদ বলে ডাকলে আমার খুব খারাপ লাগে।
- কথা সত্য। তবে দেইখো গনি থেকে না আবার গনোরিয়া হয়ে যাও। এই দেশে কোন কিছুর ঠিক নাই।
- সেইটা ঠিকই বলছেন ভাই। সরকার যদি ঠিক না থাকে দেশের মানুষ কি ঠিক থাকে?
 
 হ - শুরু হইসে সরকারের পুটু মারা। গনি ইজ ব্যাক অন ট্র্যাক। নাম নিয়া তারে বেশি গুতাইলাম না। 

- ঠিক আছে এখন গরম পানি দিয়া কাপ ধুইয়া, তোমার এক কাপ বিখ্যাত শরবত দাও।
- জ্বি বস দিতাছি। 
 
গণির মন ভালো থাকলে সে আমারে বস ডাকে। শুনতে খারাপ লাগে না। মনে হয় যে আমি বড় কোন কোম্পানির বস। 






শহরের বৃষ্টি, ২৬শে জুন

বাইরে ধুমাইয়া বৃষ্টি পড়তেসে। আরাম করে একটা ঘুম দিসিলাম। এই সময় হাসিব ভাই ফোন দিলো। তার সাথে আমার কোন দরকার নেই আজকে। মাঝে মধ্যে আড্ডা দিতে যাই, এলাকার বড়ভাই। মাগনা চা-বিড়ি খাই।

– ভাই কি খবর বলেন!
– তোর ওইখানে বৃষ্টি হচ্ছে না?
– নাতো…। আমিতো জানালার পাশে বসে আছি কোন বৃষ্টি নাই। আকাশ অবশ্য মেঘলা, যে কোন সময় কুত্তা বিলাই শুরু হয়ে যাবে।
– কি কস? আমার এইখানে তো মুষলধারে বারি ঝরছে। ঝরঝর শ্রাবনও বরষায়… আজি মন চায়…।

হাসিব ভাইয়ের একটু পোয়েট্রি করার স্বভাব আছে। কথায় কথায় তাই কঠিন সব বাংলা বলেন। এইগুলা শুনলে আমার শরীর জ্বলে।

– ধুর বাল…। ভাই আপনে ফোন দিসেন কেন?
– আমি মতিঝিল আসছিলাম, ব্যাংকের কাজে। আইসা বৃষ্টিতে আটকাইয়া পড়সি। এইদিকে আম্মায় কইতাসে বাজার লইয়া যাইতে। তোর ঐখানেতো বৃষ্টি নাই। তুই ভাই একটু কষ্ট কইরা বাসায় বাজারটা দিয়া আসতে পারবে?
– আমার কাছে টাকা নাই।
– টাকা চাইসে কেউ তোর কাছে? সব কিছু লিটনের দোকানে প্যাকেট করা আছে। আমি ফোন কইরা বলে দিসি। তুই ভাই একটু কষ্ট করে দিয়ে আয়। তোরে সন্ধ্যায় ট্রিট দিমু। আমি এখন বাসায় যাইতে পারুম না।
– আমারে ডেলিভারি বয় মনে হয়?
– তোগো এই এক সমস্যা! বড় ভাই কিছু করতে বললেই ইগোতে লাগে।
– সহমত ভাই।
– মানে?
– মানে হ… লাগে।
– ভাই, প্লিজ জরুরী কাজে আছি, একটু করে দে।
– আপনে কোন ব্যাংকে গেছেন? স্পার্ম ব্যাংক?
– তুই কিন্তু বেয়াদবি করতাসস?
– আচ্ছা সরি, বাজার দিয়া আসতেসি, কিন্তু আমারে বাকার্ডি খাওয়াতে হবে। বৃষ্টির দিন…।
– ঠিক আছে, সন্ধ্যা আসি।

টুট করে লাইন কেটে দিলো বড় ভাই রুপের প্লেবয়। আমি জানি সে তার গার্লফ্রেন্ডের বাসায় গেছে। বৃষ্টির সময় শালায় গেছে ফুর্তি করতে আর আমি ঘুম ফালায়া বেগার দিমু। অবশ্য বেগার যাবে না খাটুনি। হাসিব ভাইয়ের দিলখোলা। কে জানে সন্ধ্যায় বাকার্ডির সাথে চিকেন পোলাও হয়ে যেতে পারে।

বড় ভাই আছে বলেইতো আমরা একটু আনন্দ ফুর্তি করতে পারতেসি।

ঈদ ২০২৪

ঘুরতে বের হইসিলাম। চারিদিকে ঈদের আমেজ। কুরবানীর ঈদ আর চারদিন পরেই। রাস্তাঘাটে গরুর গোবরের প্রবল উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, শহরে নতুন মেহমান এসেছে।

ঢাকায় রিকশার সংখ্যা বেড়ে গেছে হঠাত করেই। এরা কোন গানিতিক সূত্র মেনে বাড়ে না। দুইজন থেকে হঠাত ছয়জন হয়ে যায়। আবার বৃষ্টি দেখলে দশজন হয়ে যায়। ভাড়া অবশ্য ক্রিকেটের ডার্কওয়ার্থ লুইসের পদ্ধতি মেনে দাবি করে তারা।

যাবো ধানমন্ডি, দরদাম করে ১০০ টাকার ভাড়া ১৩০ টাকায় ঠিক হলো। মনে মনে ভাবলাম, থাক গরীব মানুষই তো। দুইটা মালবোরো খাইতেই তো আমার ৩০ টাকার বেশি চলে যায়।

রিকশা থেকে নামার পর শুরু হলো তার কাহিনী।

– আপনারে দেইখা, মনে হতেসে আপনে খুব ভাল মানুষ। একটা কথা বলি?
– বলেন।
– আমার মা গ্রামে অসুস্থ তার, দুইটা কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। স্যার যদি কিছু সাহায্য করতেন।

একথা শোনার পর ১০০ টাকার ভাড়া ১৩০ টাকায় ঠিক হবার জন্য নিজেকে মনে মনে দুইবার লাথি দিলাম। শালায়তো ঘাগু মাল! দুধ দোয়ানোর চেষ্টা করতেসে।

– আমি নিজেও অসুস্থ। সেইটার জন্য কি তোমার কাছে ডিস্কাউন্ট চাইছি?
– আপনে অসুস্থ?
– হ… আমার ব্লাড ক্যান্সার। কয়দিন বাঁচি ঠিক নাই।

হতভম্ব রিকশাওয়ালাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে হাঁটা দিলাম। শালা গরীব ভালো হইতে পারে, কিন্তু ছোটলোক মাদারটোষ্টই হবে। আজকে মন ভালো তাই এর সাথে ইতরামি করলাম না।

বন্ধু ধননঞ্জয় এর বাসায় আসছি। এইটা হিন্দু হইলেও আমার খুব পেয়ারের দোস্ত। দুই, হাত খুইলা খরচ করে। বিশেষ করে মাল খাবার সময় দুই পেগ পেটে পড়লেই সবার বিল সে দিয়া দেয়। মালে মালে মালতো ভাই হয়ে যাই তখন আমরা। তারে এইবার কুরবানীর দাওয়াত দিতে হবে। গরুর মাংস না খাউক, মুরগীর রোষ্টতো খাইতে পারবে। তাছাড়া এইরকম একটা উৎসবের সময় কাউরে ফালায়া রাখা ঠিক না। মানবতা বলে একটা কথা আছেনা। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।

ধননঞ্জয় এর নামে যে কে রাখসিলো? শালার নাম শুনলেই মনে হয় প্যান্টের চেইন খুলে দেখতে। তারে অবশ্য আমি আদর করে ধনু ডাকি। ধন ডাকতে পারতাম, কিন্তু তাতে তার গার্লফ্রেন্ড মাইন্ড করবে। ঐটা নাকি তার অধিকার। একসাথে আড্ডা দিতে গেলে যখন ধননঞ্জয় এর গার্লফ্রেন্ড তারে আদর করে “ধন” বলে ডাকে, তখন মাঝে মাঝে কনফিউজড হয়ে যাই, ডাকে কারে?

ধনুর বিল্ডিং এর দারোয়ান আমারে দেইখা লম্বা সালাম দিলো। এই এক সমস্যা ঈদ আসলেই সবাই লম্বা সালাম দেয়। তিনহাত বাড়ায় দেয় বকশিসের জন্য। আরে বেটা এই সালামের কোন মানে আছে? বকশিসের আশায় সালাম দিলে তোমার সোয়াব হবে? আমি দারোয়ানরে দেইখাও না দেখার ভান করলাম। বড়লোকেরা সাধারণত দারোয়ান জাতীয় প্রানীদের দিকে তাকায় না। এটাই অভিজাত স্টাইল। আমার বাড়ির দারোয়ান মাসুদ অবশ্য আমারে দেখলে দৌড় দেয়, নাইলে লুকাইয়া থাকে।

– স্যার, ঈদের বকশিস দিবেন না?
– না দিবো না। তোমারা সালাম দেয়া হয় নাই। স্লামালিকুম কি?
– সালাম দিসিলাম।
– সালাম দিতে হয়, আসসালামু-আলাইকুম পুরা বইলা। তুমিতো শুদ্ধ ভাবে বলতে পারো নাই। তুমি কি বিসিএস ফেল?

দারোয়ানের চেহারায় শঙ্কার ছাপ। বড়লোকদের সাথে তর্ক করতে হয়না। তাতে ভাতে মরার সম্ভাবনা থাকে।

– তুমি ধনুরেও সালাম দাও?
– জ্বী স্যার দেইতো।
– কেন দাও? ও তো হিন্দু… ওরে নমস্কার বলবা।
– জ্বী আচ্ছা।
– সালামের মানে জানো?
দারোয়ান মাথা নাড়ায়। তাতে হ্যাঁ এবং না দুইটাই বুঝা যায়। আমি কনফিউজড হয়ে গেলাম। এই ব্যাটায় কি মশকরা করে। কনফিউজড করি আমি মানুষকে আর সে কিনা আমার সাথে বিটলামি করে। এই ব্যাটাতো একটা ছোটলোক।

– শোনো… সালামের মানে হচ্ছে, সামনের জনের জন্য শান্তি কামনা। তুমি আমার শান্তি কামনা করতেস না, তুমি বকশিস কামনা করতেস। কাজেই বকশিস পাবা না। আরবিতে কিভাবে বকশিস কামনা করতে হয় সেটা শিখে তারপর বকশিস নিবা।

আমি অনেক জ্ঞান দেয়া হয়েছে এই ভঙ্গিতে গেইট পার হয়ে ভিতরে ঢুকলাম।

পৃথিবীর বয়স

শুক্রবার দিনটা আমার খুব পছন্দের। সারাদিন আরাম করে ঘুমানো যায়। আমি দুই-তিনটা মুভি দেইখা ফেলি একদিনেই।

বোরিং লাগলে মাঝে মধ্যে নিচে গিয়া মাসুদরে একটু গুতা দিয়ে আসি। সে শ্রমিক দিবসের মানে বলতে না পারায় তার বেতন কাটছিলাম। ভালো লাগছিলো!

আজকে সকাল সকাল নিচে নামলাম। রাতে ইন্টারস্টেলার দেখসি। মাথা জ্ঞানের ভারে ব্যাথা করতেসে। কবি বলেছেন আনন্দ নিজের, কিন্তু ব্যাথা সবার সাথে ভাগ করে নিতে হয়। আমি তাই মাসুদরে খুঁজতেসি ব্যাথা ভাগ করে নেয়ার জন্য।

দেখি সে চেয়ারে বসে ঝিমাচ্ছে। গিয়া দিলাম চেয়ার বরাবর একটা লাথি।

মাসুদ নিচে পড়ে গিয়ে পিটপিট করে আমার দিকে চেয়ে আছে। আমার মুখে ভিলেনের হাসি দেখে তার মুখ শুকিয়ে গেছে।

– তোর জন্য একটা প্রশ্ন আছে। উত্তর দিতে পারলে আজকে দুপুরে কাচ্চি খাওয়াবো। আর না পারলে দুপুরে তোর খাবার বন্ধ।

কাচ্চির লোভে মাসুদ নাক দিয়ে একটা ঘোঁত শব্দ করল শুয়োরের মত।

– বলতো, পৃথিবীর বয়স কত?
– এইটা তো সোজা, এখন ২০২৪ সাল চলতেসে বস। তারমানে পৃথিবীর বয়স ২০২৪ বছর। মাসুদ অতি বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ল।

আমার মুখে ভিলেনের হাসি। জানতাম সে পারবে না। সে কোনদিন বিসিএস এ পাশ করতে পারবে না।

– তুমি কোনদিন জ্ঞানী হতে পারবা না মাসুদ। যাও ওই কোনায় গিয়া কান ধরে দাঁড়ায় থাকো। গেইট দিয়েই যেই আসবে তাকে মিলিটারি স্টাইলে স্যালুট দিবা। এটাই তোমার শাস্তি।

– বস আমারতো মিলিটারি বুট নাই। মাসুদ করুন মুখে বলে।
– বুট লাগবো না হারামজাদা। তুই গিয়া দুপুর পর্যন্ত দাঁড়ায় থাক। নাইলে মিলিটারি স্টাইলে তোকে ডিম থেরাপি দিবো।

আমি গেইট দিয়ে বের হয়ে আসলাম। যাই গনিরে গিয়া জিগ্যেস করে আসি, দেখি সে বিসিএস এর যোগ্য কিনা। যদিও মনে হয় গনি পারবে না। রঙ চায়ে চিনি দিয়া জিহবায় কামড় দেয়া বাদে তার বিশেষ কোন প্রতিভা নেই। যদিও সে ভাব ধরে সে রাজনীতির ব্যপারে বিশাল পন্ডিত।

গনির দোকানে আজকে কোন ভিড় নাই। শুক্রবার সকালে কি মানুষজন চা খায় না? এই জাতির কি হবে? বৃহস্পতিবার রাতে সব নেশা করে এখন ঘুমাচ্ছে।

– গনি ভাই একটা রঙ চা দাও, চিনি দিবা না।
গনি কোন কথা না বলে চা বানান শুরু করল। চোখের নিচে ফোলা, কালসিটে পড়ে আছে। নিশ্চিত রাইতে মাল খাইতে গিয়া বউয়ের হাতে মাইর খাইসে।

– কে মারসে, বউ?

গনি কথা বলে না। চায়ে চুমুক দিয়া দেখি এইটা রসগোল্লার মত মিষ্টি। শালার চুষ্টি গুদি…।

– গনি ভাই, পৃথিবীর বয়স কত জানো?
– ঐটা জাইনা কি হইব? গরীব মানুষের পুটকি মারা বন্ধ করব সরকার?
– কখন মারল?
– মজা কইরেন না ভাই। মন ‘মিজাজ’ বেজায় খারাপ। সরকার যেমনে জিনিসপত্রের দাম বাড়াই দিতেসে… বউ বাচ্চা নিয়া শহরে আর থাকা যাইব না।

আমি জানতাম গনিও পৃথিবীর বয়স বলতে পারবে না। দেশটা অশিক্ষিতে ভরে গেছে, জ্ঞানী লোকেরা এই জন্যই দেশে থাকে না। টাকা পাচার করে বাইরে চলে যায়। লাস ভেগাস আর দুবাই তাদের প্রিয় জায়গা।

– কই যাবা?
– চিন্তা করতেসি গ্রামে চইলা যাবো।
– ঐখানে কি অন্য সরকার চলে? ওইখানে গেলে কি সরকার তোমার পুটু মারবে না?

গনি বিরক্ত মুখে তাঁকাল। তবে মুখে চিন্তার ছাপ। সরকার যে একটাই এইটা সে মনে হয় চিন্তা করে নাই। গ্রামে গিয়েও যে তাকে পুটু মারা খেতে হতে পারে এই ব্যাপার সে আগে চিন্তা করে নাই।

– তুমি বরং, চায়ের বদলে শরবত বেচা শুরু করো, মোহাব্বতের শরবত। দোকানের নাম দিবা, “গনি’স পেয়ার” মানে গনির ভালোবাসা।
– তাইলে চলব?
– আলবৎ চলবে। বাঙ্গালী এখন শরবতের দোকানে লাইন দেয়। আগে টাকা পরে ওয়ানটাইমে তোমার চা দিয়া দিবা। স্পেশাল মহব্বত।
– চা?

-“হ” – তোমার চা আর শরবতে কোন তফাৎ নাই। চা বইলা বেচো দেইখাই লোকজন আসে না।
– ভাইজান কি আমারে ইনসাল্ট করলেন? আমি চৌদ্দ বছর ধইরা চা বানাই।
– চৌদ্দ কেন চল্লিশ বছর ধরে বানাইলেও তুমি শরবতই বানাবা। জ্ঞানী লোকেরা চায়ে চিনি খায়না তুমি জানো না?

গনি জিহ্বায় কামড় দিল। “দেন আরেক কাপ বানায় দেই।”

– নাহ… আর খাবো না। যেই চা বিক্রেতা পৃথিবীর বয়স জানে না, তার ব্যবসার উন্নতি হবে কেমনে?
– জানি ভাইজান, পৃথিবীর বয়স ৪৫ বছর।
– কেমনে জানলা?
– আমার জন্মের পর থেকে পৃথিবী দেখতাসি, তাই আমার বয়সের সমানই পৃথিবীর বয়স।

আমি গনির এহেন দার্শনিক কথায় চমৎকৃত হলাম। মাঝে মাঝে সে অসোর (Osho) মত বালছাল যুক্তি দেয়। শুনলে মনে হয় সে মহাজ্ঞানী।

আমি গনির দিকে তাঁকিয়ে চোখ টিপে দিলাম।

– চালায় যাও গনি ভাই, তুমি মুরিদ পাবা। এখন আরেকটা প্রশ্নের জবাব দাও ভাইবা চিন্তা। মানুষের দেহে ফুটা কয়টা?

আমি চায়ের দাম না দিয়েই চিন্তিত গনিকে রেখে হাঁটা দিলাম। সে ফুটা গুনুক।

দিনটা সুন্দর। এইরকম দিন দেখেই কবি বলেছিলেন, মরিতে চাহিনা আমি এই বেয়াক্কেলদের ভুবনে।

– কাপু একজন জ্ঞানী পরিব্রাজক

এইটা খাবা... এইটা পিউর হালাল


ভূমিকম্প

ভূমিকম্প হয়ে গেল। তখন অজু করে মাত্র বাংলাদেশ দলের খেলা দেখতে বসছিলাম।

দোয়া করব আর টপাটপ উইকেট পড়বে…।

হঠাৎ মাথা ঘুরান্টি দিল দেখে ভাবলাম প্রেসার কমে গেছে। তিনটা ডিম আর দুই গ্লাস দুধ মেরে দিলাম।

একটু পরে নিউজ পেলাম আসলে ভূমিকম্প হয়েছে।

এখন কি করব চিন্তা করতেসি! প্রেসারের ঔষধ খাবো নাকি?

অলরেডি হালুয়া টাইট হওয়া শুরু হইসে।

– একজন ডাই হার্ট বাংলাদেশ ক্রিকেট ফ্যান

২রা জুন, ২০২৪

ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়াতেই ট্রাফিক বন্ধু এগিয়ে এসে বললো, এই চোদনা কোথায় যাও?
আমি বললাম, বন্ধু এভাবে কথা বলে না।

তোমার কাগজ দেখাও।

কাগজ দেখাবো কেনো? আমিতো গাড়ি-বাইক কিছুই চালাচ্ছি না।

তাহলে হেলমেট পরে ঘুরতেসো কেন?

ওহ… ভুলে বাসা থেকে নিয়ে বের হয়ে গেছি। হাতে ব্যাথা তাই মাথায় পরে আছি।
“শালা তুমি আমাকে মামা বানাচ্ছো কেন? কাগজ দাও।” সবুজ বন্ধু রেগে গেলো।
আমি ড্রাইভিং লাইসেন্স আর গাড়ির কাগজ বের করে দিলাম।

বন্ধু এই কাগজতো তোমার দেখার কথা না। তোমার সার্জেন্ট বস কোথায়?

সার্জেন্ট ব্যাস্ত, হাদিয়া নিচ্ছেন। আমি কাস্টমার খুঁজতেসি, পারমিশন আছে।
অহ…। আমি মুচকি হাসি দিয়ে চোখ টিপে দিলাম।

হেলমেট পরে ঘুরবা না। তুমি কি রাজনীতি করো?

না বন্ধু, আমি মদনা জনগন। মাঝে মধ্যে সিদ্ধি খাই বাবার দরবারে গিয়া।

তোমার কথাবার্তা সন্দেহজনক। তুমি রাস্তায় থাকবা না।

“জ্বী জনাব… তথাস্তু” আমি লম্বা পা ফেলে হাঁটা দিলাম। গনির সাথে চায়ের মিটিং আছে। এই অর্বাচীনের সাথে সময় নষ্ট করে কোন লাভ নাই। আজকাল সত্যি কথার ভাত নাই।

গনির দোকানে এসে দেখি মেলা ভিড়। একজন ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা গনির চায়ের দুধ নিয়ে সন্দেহ পোষন করছেন। এইটা গরুর দুধ না।
গনি বেজায় খেপে আছে। সে বারবার বলছে, “আমি গরুর দুধ দিয়া চা বানাই না। আমার সব পাউডার মিল্ক।”
আমি হেলমেট পরা মাথা গলিয়ে দিলাম।

গনি ভাই ঠিক বলতেসে। গরুর দুধের চা ভালো হয়না। পাউডার মিল্কই উত্তম।
হেলমেট পরা আমাকে দেখে ভদ্রলোক বেজায় সন্দেহ নিয়ে তাঁকালেন।

আপনে কে মিয়া, গনির আত্মীয়?

নাহ, আমি কাষ্টমার…। গনি ভাই, সিদ্ধি দিয়া একটা রঙ চা দাওতো।
ভদ্রলোক চা খাবেন না বলে হাঁটা দিলেন। একবার পেছন ফিরে আমাকে ব্যাপক সন্দেহ নিয়ে দেখে নিলেন।

ভাই, চা খেয়ে যান। গরুর দুধেরটা মজার না, গাভীর হলে অবশ্য মজা পেতেন। আর পাউডারে একটা হেরোইন হেরোইন ভাব আছে।
তার হাঁটার গতি বেড়ে গেলো। সকাল সকাল পাগলের পাল্লায় পড়াটা দূর্ভাগ্যের।
গনি অবশ্য মুখ বাঁকা করে ফেলেছে। আমার কথাবার্তা তার পছন্দ না। হাজারহোক গনি একজন উচ্চমার্গীয় জ্ঞানি ব্যাক্তি। নেহাত সকাল বেলা সবার বউ চা বানায় দেয় না দেখে গনি জনসেবা করে যাচ্ছে।

কাপু উইথ লাভ ফ্রম রোড টু প্যারিস

টেসলার শহর

ঢাকায় অটোরিকশা কিছুটা বন্ধ হইসে। রাস্তায় জ্যাম কম। সকাল সকাল বাইর হইয়াই মেজাজটা ফুরফুরা হয়া গেলো।
পলাশী আইসা গনীর দোকানে চা খাইতে দাড়াইলাম। এক ভাইসাব দেখি সরকারের উপর মেলা খিস্তি দিচ্ছেন। আমিও তাল মিলাইলাম।

এইটা কোনো কাম করসে? গরীব বইলা কি ওরা মানুষ না? বিকল্প কিছুর ব্যবস্থা না করে অটো বন্ধ করে দিলে হবে?
গনী মাথা দুলিয়ে সায় দেয়। সে অবশ্য সরকারের কট্টর সমালোচক। আজকে অবশ্য কথা কম বলছে।
আমি আলোচনা উসকে দিলাম।

এই সরকার জালেম সরকার। গরীবের রক্ত চুইষা খায়।

ঠিক বলছেন ভাইজান। এই যে মেট্রো বানাইসে এইটারও দরকার ছিলো না। সব ঋনের টাকায় ফুটানি।

ঘটনা সত্য, আমি লুংগি পরে গেসিলাম আমারে মেট্রোতে ঢুকতে দেয় নাই। আমি টিপ্পনি কাটি।

তাইলেই দেখেন… সব বড়লোকের জন্য।
গনি দেখি মুচকি হাসে।

গনি তুমি হাসো কেন?

ভাইজান আপনে যে মশকরা করতাছেন হেয় বুঝতাসে না।
এবার ভদ্রলোক আমার দিকে নতুন দৃষ্টিতে তাকায়। তার চোখে সন্দেহ।

অটো রিকশা বন্ধ করে ভালো হইসে, কালকেই এক চুদিরপুতে আমারে ধাক্কা দিসে। আরেকটু হইলেই গেসিলাম। গনি বলে।
ভদ্রলোক চুপ করে আছেন। আমি তার পক্ষ নিলাম। নাইলে আলোচনা জমে না।
কিন্তু অটোরিকশা না থাকলে মানুষ অফিস যাবে কি করে?

হাইটা যাইবো, বাংগালী হাঁটে না… হাঁটলে শরীর ভালো থাকবে। গনি ব্যাপক জোসের সাথে বলে।
গনি হঠাত করে ভালো হয়ে গেলো…। আমি গনিরে চোখ টিপ দিলাম।

তারপরেও ভাইজান গরীবের পেটে লাথি দেয়া উচিৎ হয় নাই।

ভাই কি করেন আপনি? ভদ্রলোক চায়ে চুমুক দিতে দিতে জানতে চান।

আমি ভাই কিছুই করি না। লেখালেখি করি।

আপনের মনে হয় নিজের গাড়ি আছে।

আরে নাহ… আমি এত বড়লোক না। এইযে দেখেন আজকে অটো নাই তাই হাইটা রওনা দিসি।

আপ্নের অফিস কই?

লেখার জন্য অফিস লাগে না। কলম লাগে।

এই সকালে বাইর হইসেন তাই জিগাই।

কলম কিনতে বাইর হইসি। সাথে গনির ময়লা চা খামু।… আপনে কই যান?

আমার অফিস কারওয়ান বাজার।

হাইটাতো যাইতে পারবেন না। আপনেরে দেইখাই বুঝছি আপনে জমিদার বংশের লোক। গায়ে মেলা চিকনাই। একটা উবার ডাক দিয়া চইলা যান।
ভদ্রলোক সরু চোখে তাকালেন। হাতের চায়ের কাপ আমার দিকে ছুড়ে মারবেন কিনা মনে হয় চিন্তা করতেসেন। আমি বিভ্রান্তিকর হাসি দিলাম।

আমারে বাংলা মোটর নামায় দিলেই হবে। ওইখানে নাকি ভালো কলম আর সাদা কাগজ পাওয়া যায়। আজকে সরকারের মা-বাপ এক করে লিখতে হবে। দূর্নীতি করে দেশের বারোটা বাজায় দিতেসে।

আপনে বেশি কথা বলতেসেন। আমি উবার ডাকবো কেন?

তাইলে লন সিএনজি লইয়া দুই ভাই যাইগা।
ভদ্রলোক কথা না বাড়িয়ে চায়ের দাম দিয়ে দ্রুত হাঁটা দিলেন। চা শেষ হলো না তার।
সরকারের বিরুদ্ধে খিস্তি দেওয়া এক কথা আর পাগলের পাল্লায় পড়লে সাড়ে সব্বোনাশ।
আমি গনির থেকে একটা মালবোরো নিয়ে আরাম করে ধরালাম। বিড়ি বেইচা বড়লোক হওয়া আকিজ কোম্পানি মালবোরো বেইচা দিসে জাপানিগো কাছে। এরপর থেকেই সিগারেটে আর আগের মত স্বাদ পাই না।
সরকার এইগুলা দেইখাও দেখে না। নাহ একটা জ্বালাময়ী লেখা লিখতেই হবে।

গনি চা-বিড়ির দাম আমার খাতায় লেইখা রাখ। আমি হাওয়ামে উড়তা যায়ে গাইতে গাইতে গনিরে বিদায় জানালাম। আজকের দিনটা সুন্দর!


— কাপু

মুরুব্বি

আজকে গরম একটু কম পড়ছে। সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেলো।
একটা বিড়ি সেবন করার উদ্দেশ্যে মজিদের দোকানের দিকে রওনা দিবো। সিড়ি ভেঙে পাঁচতলা থেকে নিচে নামলাম। বিল্ডিং এর লিফট নষ্ট। বাড়িওয়ালা হিসেবে আমার উচিৎ লিফট ঠিক করে দেয়া, কিন্তু দিচ্ছি না। এই গরমে সিড়ি দিয়ে উপরনিচ করলে ভাড়াটিয়াদের ব্যায়াম হয়। একটু আল্লাহর নাম নেয় মুখে। ঘাম ঝরানোর সুফল আছে।
নিচে নেমে দেখি মাসুদ হারামজাদা গেইটে নাই। ঘটনা কি?
কালকেই বাটাম দিসিলাম দিনে ২ বার গোসল করার জন্য। ব্যাটা তুই থাকস একা। বউ গ্রামে। এইখানে তোর ২ বার গোসল করা কি ফরয? এমনিতেই পানি পায় না সাধারণ পাবলিক। তারওপর তুই পানি নষ্ট করিস!
তারে বলসিলাম, সিটি কর্পোরেশন রাস্তায় পানি ছিটায়, ঐখানে গিয়া গোসল করে আসতে।
মেজাজ খারাপ করে মজিদের দোকানে আসতেই দেখলাম, শালায় এইখানে বইসা চা-কলা খাচ্ছে।

কিরে তুই গেইট রাইখা এইখানে কি করস?

বস আজকে তো মে দিবস?

এইটা আবার কি?
মাসুদের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।

বস, মে দিবস মানে সব শ্রমিকের ছুটি। এইদিনে শ্রমিকেরা যা খুশি করে। এই দিনে আমরা ভাষার জন্য প্রান দিয়েছিলাম।

তবে রে নাটকির পো- তুই কলা খাওয়া শেষে আমার সাথে দেখা করবি বাসায়। সাথে একটা কাঁচা কলা আর চিকন কঞ্চি নিয়া আসবি। আমি আজকে মহান মে দিবস পালন করব তোর সাথে।
মাসুদের মুখ শুকায় গেলো। চা রেখে দিলো দৌড়। আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম। ওর পিছে এই সাত সকালে দৌড় দেবার কোন ইচ্ছা নাই। গরু সন্ধ্যায় ঠিকই বাসায় ফিরবে।
আরাম করে একটা মালবোরো ধরালাম। এইসময় এলাকার মুরুব্বি আইসা উপস্থিত। আমি তারে না দেখার ভান করলাম। উপরদিকে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কারেন্টের তারে বসা কাক দেখছি।
মুরুব্বি সেয়ানা, আমার সামনে এসে ব্রেক করে থেমে গেলো। গলা খাঁকারি দিলো একবার।

বাবাজি কেমন আছো?
আমিই বিরস বদনে হাতের সিগারেট ফেলে দিলাম। দুনিয়ায় শান্তি নাই।

আসসালামুয়ালাইকুম কাকা। ভাল আছি। আপনার দেহ কেমন আছে?
কাকায় একটু থমকে গেলো।

দেহ মানে?

দেহ মানে শরীর। সবাই শরীর বলেতো আমি দেহ বলি। ঐযে জেমস ভাই গান গাইছিলো না, “ঝাকানাকা ঝাকানাকা… দেহ দোলা না।”

ও… মুরুব্বি এখনও বুঝতে পারে নাই আমি বিরক্ত। সে লম্বা আলাপের জন্য তৈরি হচ্ছে।

তা বাবা বলতেই পারো, দেহ আর শরীরতো একই।

না এক না। আমি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। যাদের এই বয়সে চিমশা মারা বডি থাকে তাদেরকে শরীর বলা যায়। আর যারা আপনার মত হাতির বডি নিয়া ঘোরে তাদেরকে “দেহ” বলতে হয়।
মুরুব্বি আমার কথায় কিঞ্চিত মাইন্ড খাইলেন। “বেয়াদব” বলে চলে গেলেন।
আজকাল জ্ঞানের কোন দাম নাই। এইজন্যই সমাজের এই অবস্থা।
যাই বাসার দিকে যাই। সকালটাই মেজাজ গরম দিয়ে শুরু হলো। শ্রমিক মাসুদের আজকের বেতন কেটে রাখতে হবে। সে অজ্ঞানী, মে দিবসের তাৎপর্য তার বোঝা দরকার।

ইফতার

ইফতারের পরে ব্রি সেবন করার জন্য মজিদের চায়ের দোকানে গেলাম। গিয়া দেখি মাসুদ। তাই তো কই গেইট ফাকা কেন। হালায় কাম রাইখা এইখানে আইসা আড্ডা দেস? আবার ব্রি খাস...?

 
পিছন থেকে কোমর বরাবর দিলাম এক লাথি। ফুটপাতে গড়ায় পড়ে গেলো। "কোন শা..." বলতে বলতে আমারে দেখে থেমে গেলো। পিট পিট করে দুইবার তাকায়া উইঠা দিলো দৌড়।
 
মজিদের কাছ থেকে মালবোরো নিয়া একটা সুখটান দিলাম। জিগাইলাম কিরে মজিদ মন খারাপ কেন?
- আপনের ডরে ভাইগা গেসে। মাসুদের কাছে ২৫০ টাকা পাই। 
 
- আমার সিগারেটের দামও ওর খাতায় লেইখা রাখ। শালারে বানাইতে হবে। বেয়াদব হয়ে গেসে। 
 
মজিদরে কিছু বলার সুযোগ না দিয়া নাইমা আসলাম রাস্তায়। ফুটপাতে ব্যবসা করলে এইরকম হবেই। গরীব মাইনষের জাতই না। ট্যাক্স দিতে হবে ট্যাক্স...। ট্যাক্স না দিলে সরকার চলবে কেমনে? দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার দায়িত্ব আছে ট্যাক্স আদায় করার।
 
দুইটা লাল গেঞ্জি পরা পোলা দেখি রাস্তায় লোকজনরে ইফতার দিতেসে। ইফতারতো আধা ঘন্টা আগে শেষ, এখন কি দেয়? 
 
আমিও বইসা গেলাম ফুটপাতে। আমার সামনে আসতেই হাত বাড়ায়া দিলাম। প্রথম জন আমারে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতেসে। কাপড়চোপড় দেইখা মনে হয় ইফতারি দিবে না।
 
- দেস না কেন? আমারে দিতে মানা করসে?
 
দ্বিতীয় জন ভয় পেয়ে আমার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিল। যারা তুই তোকারি করে তাদের সাথে সাবধানে কথা বলতে হয়।
 
- প্যাকেটে কি? খুইলা দে। আমি খুলতে পারব না। 
 
প্রথমজন এবার আমার প্যাকেট খুলে দিল তার চোখে ভয়।
 
- তোমারে দেখেই মনে হইতেসে রেস্টুরেন্টের ওয়েটার। এইগুলা ওইখান থেকে নিয়া আসছো? ভেজাল খাওয়াইয়া গরীব মারার ধান্দা। 
 
"তোদের দুইটারে ভোক্তা অধিকারে ধরাইয়া দিয়া বিচি কান্দে তুলে ফেলতে হবে।"
 
দুই লাল গেঞ্জিও দৌড় দিল। শালা বেকুব। জগিং টাইম সকালবেলা ইফতারির পরে দৌড়াবি কেন?
 
আমি আরামসে ফুটপাতে বসে বসে বেগুনি আর আলুর চপ খাচ্চি। প্যাকেটে একটা জিলাপিও আছে দেখি। নাহ... জিলাপি খাওয়া যাবে না, সুগার বেড়ে যাবে। পরে লোকে সুগার ড্যাডি ডাকবে।
 
দুইটা খেজুর আছে, ল্যাটকাইয়া ভর্তা হয়ে গেছে। এইগুলা প্যাকেট সহ পকেটে রেখে দিলাম। মাসুদরে দিয়া দিবো। সারাদিন কি খায় না খায়।
 
-কাপু