ডেভের ঢাকা ভ্রমন
খেজুরের রস খাবার জন্য ডেভকে নিয়ে গেলাম ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহ। ডেভ মানে ডেভিড মিলার। তাকে শাস্তিস্বরূপ (!) বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।
দেশে কোন এক ক্ষমতাবানের পেছনে আঙুল দিয়েছে তাই কানাডা অফিস থেকে সোজা ঢাকায় বদলি। ডেভ অবশ্য এটাকে কান্ট্রি এক্সপ্লোর করার সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। একটুও মন খারাপ করেনি।
আমাদের প্রজেক্টে আরো তিনজন ফরেনার কাজ করে। কিন্তু ডেভের সাথেই আমার খাতির বেশি। কারন প্রায় প্রতিদিন আমরা অফিস শেষে শুরা পানের আড্ডায় বসি। একটু মাতাল হলেই ডেভ তার দুঃখের কথা বলে, দেশে ফেলে আসা গার্লফ্রেন্ডের কথা বলে। আর বলে বাংলাদেশের মানুষ এত ভালো... এখানে না আসলে বুঝতেই পারতাম না। আমি কিছু বলি না শুধু মুচকি হাসি। গুলশান বনানীর বাইরে গত তিনমাসে সে খুব একটা কোথাও যায়নি।
তো এবার ময়মনসিংহ গিয়ে তার ভুল ভাঙ্গলো। তৌহিদি জনতা দিপু চন্দ্র দাস নামে একজনরে পিটিয়ে মেরে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে মারছে। ডেভ এই ঘটনা চাক্ষুস করেছে। মারামারি যখন চলছে আমাকে বলল, চল ওকে সেইভ করি।

আমি হতাশ হয়ে বললাম, পারবা না। সে হিন্দু।
- কিন্তু এভাবে মারলে তো মরে যাবে।
- সেটাই ওদের লক্ষ্য। তুমি বাঁচাতে গেলে তোমাকেও মারবে। সাদা চামড়া খুব বেশি দেখে না আমাদের দেশের মানুষ।
- কেন মারবে?
আমি হতাশ হয়ে দেশের বর্তমান অবস্থার কথা বললাম। দেশে পুলিশিং নাই সেটাও বললাম।
- তাই বলে একটা মানুষকে শুধু ধর্মের নামে পিটিয়ে মেরে ফেলবে?
- খালি মারবেই না, একটু পরে লাশ পুড়িয়েও দেবে। প্রমান রাখা যাবে না। তৌহিদি জনতা বোকা না।
- ওহ লর্ড। ডেভের চোখ কপালে উঠেছে ততক্ষনে। "এত বড় ক্রাইম হয়, আর তোমাদের সরকার কিছু বলে না?"
- তুমি বেশি মন খারাপ করোনা। আমাদের এখানে কবর থেকে তুলে লাশ পোড়ানো হয়েছে কয়দিন আগে। এখন লাশ বানিয়ে পোড়ানো হচ্ছে। প্র্যাক্টিস মেইকস অ্যা ম্যান পারফেক্ট!
ডেভ আমার দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকাচ্ছে। আমার নির্বিকার ভঙ্গি তার ভাল লাগছে না। আমি এই বোকা কানাডিয়ানকে নিয়ে কি করব বুঝতে পারছি না।
ঢাকায় ফিরতে বেশ রাত হয়েছে। সারা রাস্তা ব্লকেড। একজন বিপ্লবী মারা গেছেন। তার অনুসারীরা নানা জায়গায় মব তৈরি করে আগুন দিচ্ছে, ভাঙচুর করছে। শুনলাম প্রথম আলু আর ডেইলি স্টারেও নাকি আগুন দিয়েছে। ছায়ানটে ভাংচুর চলছে। মারহাবা!
ডেভকে খুব আতংকিত দেখলাম। সে ভাবছে দেশে গৃহযুদ্ধ লেগে গেছে!
- এই দেশে হচ্ছে কি? তুমি ভয় পাচ্ছ না?
- কেন...? প্রেস্ক্রিপশন চেনা লাগছে না? কালার রেভুলুশ্যন এর পরে এরকমইতো হয়ে থাকে।
- করলাম না এই ছাতার চাকরি। কালকে সকালেই রিজাইন দিয়ে নিজের দেশে চলে যাবো।
- সেটাই ভালো, সাদা চামড়ারা সব চলে যাক। আমি দুই লাইন কবিতাও শুনিয়ে দিলাম ডেভকে-
- তুমিও আমার সাথে চলো। এই পাগলের দেশে থেকে কি করবে? এখানে জীবনের নিরাপত্তা নেই।
আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, "তুমি তোমার দেশে যাবে, কিন্তু এটাই আমার দেশ।"
- তাই বলে এরকম মূর্খদের মাঝে থাকতে হবে?
আমি হতাশ স্বরে বললাম, পালিয়ে যাবো কোথায়? আমার পাসপোর্ট সবুজ রঙের। কানাডিয়ান বা আমেরিকান ভিসা নেই। চাইলেই তুমি ভাগতে পারবে না।
ডেভ বিড়বিড় করে কি বলল বোঝা গেলনা। সে হয়ত এখন বুঝতে পারছে তাকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে কেন।
-- ইয়াসিন ব্যাপারী
-- গার্মেন্টস ব্যবসায়ী
ঢাকা, ১৯শে ডিসেম্বর, ২০২৫

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন